الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ وَالصَّلُوةُ وَالسَّلَامُ عَلَى سَيِّدِ الْمُرْسَلِينَ وَخَاتَمِ النَّبِيِّينَ وَعَلَى آلِهِ وَأَصْحَابِهِ أَجْمَعِينَ ، أَمَّا بَعْدُ : فَأَعُوذُ بِاللهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيْمِ: قَدْ أَفْلَحَ مَنْ تَزَكَّى° وَ ذَكَرَ اسْمَ رَبِّهِ فَصَلَّى ° بَلْ   تُؤْثِرُوْنَ الْحَيُوةَ الدُّنْيَا ° وَالْآخِرَةُ خَيْرٌ وَ أَبْقَى  °          وَقَالَ النَّبِيُّ

صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أَمَا أَنِّي اسْتَغْفِرُ اللهَ وَ أَتُوبُ إِلَيْهِ كُلَّ يَوْمٍ مِئَةَ مَرَّةٍ.


মুসল্লিয়ানে কেরাম!

গত দুই জুমুআয় আলােচনা করা হয়েছিল সাহাবায়ে কেরাম রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে নছীহত তথা উপদেশ চেয়ে চেয়ে নিতেন । 
আমরা সকলেই নছীহতের মুহতাজ,আমাদের প্রয়ােজনেই কুরআন হাদীছের সব নছীহত এসেছে। 
আল্লাহ পাকও আমাদেরকে নছীহত করেছেন, 
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও আমাদেরকে নছীহত করেছেন, কোরআনে কারীমের সবটাই নছীহত। 
তার মধ্যে একটা আয়াতের মধ্যে আল্লাহ পাক আমাদেরকে খাস করে

দুইটা বিষয়ে নছীহত করেছেন। 

ইরশাদ হয়েছে,


قد افلح من تزكى‌°  وذكراسم ربه فصلي°                          
                   
(সূরা আলা: ১৪-১৫)

অর্থাৎ, অবশ্যই সফলকাম হবে সেই ব্যক্তি যে নিজেকে পবিত্র রাখবে। আর আমাকে স্মরণ করে ইবাদত করবে। 
বিশেষভাবে নামাযের মাধ্যমে আমাকে স্মরণ করবে।

এ আয়াতে দুটো আমলের কথা বলা হয়েছে

এক হল নিজেকে পবিত্র রাখা অর্থাৎ, খারাপ
আকীদা, খারাপ চরিত্র ও গােনাহ থেকে পবিত্র রাখা। 
আর এক হল আল্লাহকে স্মরণ করা, বিশেষভাবে
নামাযের মাধ্যমে আল্লাহকে স্মরণ করা। 
যদি কখনও গােনাহ হয়ে যায় তাহলে তওবা করে নিতে হবে।
তওবা করলে গােনাহ থেকে পবিত্র হওয়া যাবে। আর আল্লাহকে স্মরণ করতে হবে। 

বিশেষভাবে
আল্লাহ রব্ধুল আলামীন নামাযের মাধ্যমে স্মরণ করার কথা উল্লেখ করেছেন। ইবাদতের ভিতরে সবচেয়ে বেশী যে ইবাদত করতে হয়, তাহল নামায। তাই বিশেষভাবে নামাযের কথা বলা হয়েছে। অন্যান্য ইবাদত সব সময় করতে হয় না। 

রোযা বছরে একবার মাত্র এক মাস। 
যাকাত বছরে একবার, তাও সবার উপর নয়, যারা ধনী
শুধু তাদের উপরে। 
হজ্জ যিন্দেগীত মাত্র একবার ফরয হয়, তাও সকলের উপরে নয় বরং বিশষ কিছু মানুষর উপরে। 

তাই একমাত্র নামায-ই এমন যা সকলকে করতে হয়, সব সময় করতে হয়।
এজন্য কুরআন হাদীছে ইবাদতের মধ্যে বিশেষভাবে নামাযের কথা বেশী করে বলা হয়েছে। এই আয়াতেও আল্লাহ পাক তাই বলেছেন।

এ আয়াত বলা হয়েছে, যারা গােনাহ থেকে নিজেকে পবিত্র রাখল আর ইবাদত করল বিশেষভাবে নামায আদায় করল, তারা হল কামিয়াব তথা সফলকাম। 

বােঝা গেল, কামিয়াবী তথা
সফলতা অর্‌জিত হবে দুটো আমলের ভিত্তিতে। একটা হল নিজেকে গােনাহ মুক্ত রাখা, আরেকটা হল ইবাদত করা। 

যারা এই দুটো আমল করবে আল্লাহ পাক তাকীদ সহকারে বলেছেন যে, অবশ্যই তারা কামিয়াব হবে, অবশ্যই তারা সফলকাম হবে।

নিজেকে গোনাহ থেকে মুক্ত রাখার বড় উপায় হল তওবা করা। 

গােনাহ মানুষের হবেই।
একমাত্র আম্বিয়ায়ে কেরাম (আ.) ছাড়া আর কোন মানুষ গােনাহ থেকে মুক্ত নয়। অতএব গােনাহ
আমাদের হবেই তবে গােনাহ হলেই তওবা করে নিতে হবে। যখনই গোানাহ হবে তওবা করে নিতে
হবে। তওবা করলে এমন হয়ে গেলাম যেন গোনাহই হয়নি। হাদীছ শরীফে এসেছে,

التاءب من الذنب كمن لا ذنب له         

অর্থাৎ, গােনাহ থেকে যে তওবা করে, সে ঐই ব্যক্তির ন্যায় যার গােনাহই হয়নি।
যাহােক নিজেকে পবিত্র রাখা এবং ইবাদত করা- এই দুটো আমলের কথা আল্লাহ পাক
বলেছেন। 

এই দুটো আমলের কথা বলার পর আল্লাহ রব্বুল আলামীন বলেছেন,

بَلْ تُؤْثِرُوْنَ الْحَيٰوةَالدُّنْيَا                          
 

অর্থাৎ, বরং তােমরা পার্‌্থিব জীবনকে অর্থাৎ, দুনিয়ার স্বার্থকে প্রধান্য দাও।
এই কথাটুকুর মধ্যে আল্লাহ পাক বােঝাতে চেয়েছেন যে, তােমরা পদে পদে গােনাহ থেকে নিজেদেরকে পবিত্র রাখবে এবং ইবাদত করবে- এটা তােমাদের দ্বারা হয়ে ওঠে না এ কারণে যে,
তােমরা পদে পদে দুনিয়াকে প্রাধান্য দাও। দুনিয়াকে প্রাধান্য দিতে গিয়েই তােমরা গােনাহে জড়িয়ে পড়, দুনিয়াকে প্রাধান্য দিতে গিয়েই তােমরা দ্বীন থেকে সরে যাও।

আমাদের অভ্যাস হল প্রত্যেকটি পদে পদে আমরা দুনিয়ার স্বার্থকে প্রাধান্য দেই। এ কারণে
পদে পদে আমরা গােনাহে জড়িয়ে পড়ি এবং দ্বীন ও ইবাদত থেকে বিছ্যুত হয়ে যাই। 

দুনিয়ার কাজতাে আমরা দুনিয়ার স্বার্থে করিই, এমনকি আখেরাতের কাজ এবং ছওয়াবের কাজও দুনিয়ার স্বার্থকে
সামনে রেখে করি, দুনিয়ার স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে করি। 

একবার 
আমার কাছে এক ভাই এসে বললেন
যে, হুজুর! এক বছর হল আমার আব্বা ইন্তেকাল করেছেন, এখন আব্বার জন্য মৃত্যুবর্ষিকী পালন করতে চাই, কীভাবে করব আমাকে একটু পরামর্শ দিন! আমি বললাম, আপনি এভাবে পরামর্শ চাইলেই ভাল হত যে, হুজুর! আমার আব্বার মৃত্যুবার্ষিকী পালন করতে চাই এটা করা ঠিক হবে কি
না? আদৌ এটা করা যাবে কি না এই পরামর্শ আগে। যদি করা যায় তারপরে এটা কীভাবে করা হবে তার পরামর্শ। 
আপনি তাে সিদ্ধান্ত নিয়ে এসেছেন যে, মৃত্যু বার্ষিকী পালন করবেনই, এখন কীভাবে করবেন তার পরামর্শ চাচ্ছেন। 

মৃত্যু বার্ষিকী-ই তাে শরীয়তে নেই। আপনারা এটা কেন করেন?
লােকটা বলল, হুজুর! এক বৎসরের মাথায় আত্মীয়-স্বরজন সবাই এক জায়গায় হব, দেখা-সাক্ষাৎ
হবে। এতটুকুও না করলে আত্মরীয়-স্বজন অসন্তুষ্ট হয়ে যাবে। তখন আমি বললাম, তাহলে
মৃত্যুবার্ষিকীর উদ্দেশ্য এটাই যে, আত্মীয়-স্বজনের দেখা সাক্ষাৎ হবে, তারা সন্তুষ্ট হবে! তাহলে
আত্মীয়-স্বজনের সন্তুষ্টির জন্য মৃত্যুবার্ষিকী করছেন? তাহলে তাে এটা দুনিয়ার কাজ হয়ে যায়, দ্বীনের
কাজ হয় না। মৃত ব্যক্তিদের জন্য আমরা যা কিছুই করব তা সহীহ তরীকা অনুযায়ী এবং সহীহ নিয়তে
হতে হবে। তা না হলে তাে আল্লাহর কাছে চওয়াব পাওয়া যাবে না। যাহােক দেখা গেল আমরা মৃত্যু
বার্ষিকী পালন করি আত্ীয়-স্বজনকে খুশী করার জন্য এবং এই চিন্তা করে যে, আত্মীয়-স্বজন এবং
মানুষে কী বলবে যে, আমরা কিছুই করলাম না। এভাবে ছওয়াব রেছানীর মত একটা দ্বীনী কাজের

ক্ষেত্রেও আমরা দুনিয়ার স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে কাজ করি। আমরা আখেরাতকে প্রাধান্য দেই না, বরং দুনিয়াকে প্রাধান্য দেই। ফেকাহর কিতাবে লিখা হয়েছে মাইয়্যেতের জন্য কিছু করার সবচেয়ে উত্তম পন্থা হল তার ঈছালে ছওয়াবের উদ্দেশ্যে সদকায় জারিয়া করা। মসজিদ, মাদ্রাসা ও এতীমখানায় দান-সদকা করা হল সদকায়ে জারিয়া। 

এটা করতে অনেক সময় মনে চায় না কেন? কারণ এটা তাে কেউ দেখে না। মাদ্রাসায় দশ হাজার টাকার কিতাব কিনে দিলাম কেউতাে দেখলনা। আমি যে আমার বাপের জন্য
করলাম কেউতো বুঝলই না। হাঁ সবাইকে ডেকে গরু মেরে খাওয়ালাম, দশ বিশ হাজার খরচ করলাম, তাহলে সবাই দেখল জানল যে, বিরাট কিছু করলাম, তাই এটা ভাল লাগে। এই দেখানাে জানানাের চিন্তা হল দুনিয়ার স্বার্থ। 
এভাবে দ্বীনের কাজও আমরা দুনিয়ার স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে করি। তাই বলছিলাম যে, আমাদের অভ্যাস হল প্রত্যেকটি পদে পদে আমরা দুনিয়ার স্বার্থকে প্রাধান্য দেই। এ কারণে পদে পদে আমর গােনাহে জড়িয়ে পড়ি এবং দ্বীন ও ইবাদত থেকে বিচ্যুত হয়ে যাই। 

যখন একটা বাচ্চা জন্মগ্রহণ করে তখন প্রথম সামনে আসে তার নাম রাখার বিষয়টি। 

এ ক্ষেত্রেও আমরা দুনিয়ার স্বার্থকে প্রাধান্য দেই। নামের ব্যাপারে হাদীছে বলা হয়েছে,

اِنَّ اَحَبَّ اٰسْمَاءِكُمْ اِلَى الله عَبْدُاللّٰهِ وَ عَبْدُالرَّحْمٰنِ                      
 
অর্থাৎ, আল্লাহর নিকট সবচেয়ে বেশী পছন্দনীয় নাম আব্দুল্লাহ ও আব্দুর রহমান।
"আব্দুল্লাহ" শব্দের অর্থ আল্লাহর গোলাম, আল্লাহর দাস। আব্দুর রহমান শব্দের নামও অনুরূপ।
অর্থাৎ, দয়াময় আল্লাহর গােলাম বা দাস।
এই দুটো নামই সবচেয় ভাল নাম। কারণ, এই নামের মাধ্যমে মানুষের আসল পরিচয়টা ফুটে উঠেছে। আমি আব্দুল্লাহ, তথা আল্লাহর গােলাম, এটাই আমার আসল পরিচয়, এটাই আমার সবচেয় ভাল পরিচয়। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যখন আল্লাহ রব্বুল আলামীন মে রাজে নিয়ে যান, একদম নিজের দরবার পর্যন্ত নিয়ে যান। এটা ছিল মানব জীবনের জন্য সবচেয়ে উচু মর্যাদার বিষয় যে, দুনিয়ায় থাকতে সরাসরি আল্লাহ পাক তাঁর দরবার পর্যন্ত নিয়ে যাচছেন। রসূল সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আল্লাহ পাক এই মর্যাদা দান করেছেন। কুরআন শরীফের যেখানে এই মর্যাদার বর্ণনা দেয়া হয়েছে, সেখানে আল্লাহ পাক বিষয়টি বর্ণনা করতে গিয়ে "আবদ" শব্দ ব্যবহার করে বলেছেন যে, আল্লাহ তাঁর অবদকে তথা তাঁর গােলামকে তাঁর দরবারে নিয়ে গেছেন। এখানে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আল্লাহর আবদ বা "গােলাম" বলে পরিচয় দেয়া হয়েছে।
কারণ এটাইতো মানুষের জন্য সবচেয়ে মর্যাদার বিষয়। তাই সবচেয়ে ভাল নাম হল আব্দুল্লাহ, তারপর
হল আব্দুর রহমান। তারপর আম্বিয়ায়ে কেরাম (আ.)-এর নামে নাম রাখা, সাহাবীদের নামে নাম রাখা, বুযুর্গানে দ্বীনের নামে নাম রাখা। এর বাইরে অন্তত একটা ভাল অর্থ দেখে নাম রাখা। এই হল নাম রাখার নীতি। 

কিন্তু আমরা যখন নাম রাখতে যাই, তখন এসব ভাল নাম বাদ দিয়ে আনকমন নাম খুঁজি, সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমধর্মী নাম খুঁজি। এমন একটা নাম রাখতে চাই যে নাম কেউ রাখেনি, যেন মানুষে
বলে সাংঘাতিক একটি নাম রেখেছে। মানুষে যেন আমার প্রশংসা করে যে, নাম নির্বাচন করার ক্ষেত্রে আমার কোন জুড়ি নেই। এখানেও দেখা যায় যে, নিজের ভিতরে দুনিয়ার স্বার্থ ঢোকানোে হচ্ছে। তাই বলছিলাম জন্ম থেকেই প্রত্যেকটা পদে পদে আমরা দুনিয়ার স্বার্থ চিন্তায় রাখি। দুনিয়ার স্বার্থকে
প্রাধান্য দেই।

এরপর যখন বাচ্চা বড় হয়, লেখা-পড়া শেখানার প্রশ্ন আসে,

তখনও দুনিয়ার স্বার্থ চিন্তায়
রাখি। তখন চিন্তা করি যে বিদ্যা শেখালে টাকা-পয়সা বেশী হবে, দুনিয়ার বাড়ি-গাড়ী হবে সেই বিদ্যা শেখাব। আর কুরআন হাদীছ শেখালে কী হবে? কুরআন হাদীছ শেখালে তাে মানুষের কাছে
হাত পেতে খেতে হবে। এতাে ফকীরী বিদ্যা! নাউজু বিল্লাহি মিন যালিক! অথচ যারা কুরআন-হাদীছ ভাল করে লিক্ষা করেন, তাঁরা কারও কাছে হাত পেতে খান না। কুরআন হাদীছের শিক্ষাকে ফকিরী বিদ্যা বললে ঈমানের উপরে আঘাত এসে যায়। এই শিক্ষার প্রবর্তনকারী রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম। অতএব এই বিদ্যাকে ফকীরী বিদ্যা বললে তার আঘাত রসূল সাল্লাল্লরাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপর গিয়ে পড়ে। এই শিক্ষার প্রবর্তনকারী রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফকীর ছিলেন না। আল্লাহ তাআলা তাঁকে দুনিয়া দিতে চেয়েছেন, কিন্তু তিনি দুনিয়া নেননি। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলা হয়েছে, চাইলে আপনার জন্য মক্কার উপত্যকাকে স্বর্ণ বানিয়ে
দেয়া হবে, উহ্দ পাহাড়কে স্বর্ণ বানিয়ে দেয়া হবে। কিন্তু রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমি তা চাই না। আমি চাই এক ওয়াক্ত খেয়ে থাকব তাে শােকর আদায় করব, আরেক ওয়াক্ত না খেয়ে থাকব তখন ছবর করব। তিনি কেন এরকম অভাবের যিন্দেগী বেছে নিয়েছিলেন
তার কারণ তিনি বলেছেন যে, সম্পদের যিন্দেগী মানুষকে ধ্বংস করে দেয়, সম্পদের যিন্দেগী গােনাহের পথে আগে বাড়ায়। যাদের সম্পদ বেশী তারাই পাপ করতে পারে বেশী। যাদের সম্পদ নেই তারা ইচ্ছা করলেও অনেক পাপ করতে পারে না। 

রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
অভাবের যিন্দেগী পছন্দ করেছেন, আল্লাহর কাছেও এরূপ যিন্দগী পছন্দনীয়, তাই যারাই রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পথে আসে, রসূলের বিদ্যায় বিদ্যান হয়, আল্লাহ পাক সাধারণভাবে দুনিয়াতে তাদেরকে ধন-সম্পদ কম দেন। আবার অনেককে বেশীও দিয়ে থাকেন।
অতএব কোনক্রমেই এই বিদ্যাকে ফকীরী বিদ্যা বলে তাচ্ছিল্য করার অবকাশ নেই। 

কুরআন হাদীছকে নিয়ে কোনভাবে তাচ্ছিল্য করা হলে, ইসলামের কোন আদর্শকে নিয়ে কোনভাবে তাচ্ছিল্য
করা হলে ঈমান নষ্ট হয়ে যায়।
আমরা বাচ্চা-কাচ্চাকে দুনিয়া শেখাই, জেনারেল শিক্ষায় শিক্ষিত করি, এটা জায়েয, যদি নিয়ত সহীহ হয়, নিয়ত ভাল হয়। 

কিন্তু সরাসরি গােনাহ- এমন কোন কিছু শেখানাে কোনত্রমেই জায়েয নয়। যেমন অনেকে বাচ্চা-কাচ্চাদেরকে, বিশেষভাবে মেয়েদেরকে গান শেখায়। মুসলমান নিজের
পয়সা ব্যয় করে কীভাবে বাচ্চাকে গান শেখায় যার পুরােটাই গােনাহ? আমার কষ্টের উপর্জিত পয়সা
দিয়ে আমি আমার বাচ্চাকে হারাম জিনিস শেখাতে পারি? এর দ্বারা একদিকে আমার পয়সা হারাম
পথে ব্যয় হল সেই গােনাহ হবে, সেই সাথে সাথে সে গান শিক্ষা করে যতদিন গাইবে, তার পাপ তারও হবে আমারও হবে। এই গান শেখানােও দুনিয়ার স্বার্থ চিন্তায় হয়ে থাকে। যারা বাচ্চাদেরকে গান শেখায় তারা মনে করে বাচ্চাদেরকে গান শেখালে মানুষ আমাদেরকে স্মাটি মনে করবে, যুগ
সচেতন মনে করবে, আমাদের বাচ্চাদেরকেও স্মা্ট মনে করবে। তাহলে দেখা গেল এখানেও আমরা
দুনিয়ার স্বার্থকে প্রাধান্য দেই বলে সঠিক পথ থেকে বিচ্যত হয়ে যাই। 

বাচ্চাদের লেবাস-পােশাক ও বেশ-ভুষার ক্ষেত্রও আমরা মনে করি 

এমন লেবাস-পােশাক হওয়া চাই যার দ্বারা মানুষে আমাদেরকে স্মার্ট মনে করবে, যুগ সচেতন মনে করবে, আমাদের
বাচ্চাদেরকেও স্মার্ট মনে করবে, প্রগতিশীল মনে করবে। বুযুর্গানে দ্বীনের লেবাস-পােশাক, উলামায়ে কেরামের লেবাস-পােশাক গ্রহণ করি না কেন? কারণ, আমরা ভাবি তাহলে মানুষে টিটকারী দিবে, টিপপনী কাটবে যে, হুজুর হয়ে গেছে বলবে। সেকেলে! পুরাতন চিন্তার অধিকারী!! ইত্যাদি। দেখা
গেল এখানেও আমরা মানুষের কাছে ভাল থাকতে চাই। এটাই হল দুনিয়ার স্বার্থ চিন্তা। এখানেও আমরা দুনিয়ার স্বার্থকে প্রাধান্য দেই বলে সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে যাই।

বিবাহ-শাদীর সময়ও আমরা দুনিয়ার দিককে প্রাধান্য দেই।

বিবাহ করা হয় অনেক কিছু দেখে রূপ লাবণন্য দেখে, বংশ গরীমা দেখে, বাপের কি কি সম্পদ আছে, গাড়ী-বাড়ি কয়টা আছে, বিয়ে করলে আমি কতটুকু পাব হিসাব-নিকাশ করে বিবাহ করা হয়। এভাবে অনেক কিছু দেখেই বিবাহ করা
হয়। এ ক্ষত্রেও আমরা দুনিয়াকে প্রধান্য দেই। অথচ হাদীছে বলা হয়েছে,

فَاظْفَرْ بِذَتِالدِّيْنِ                               

অর্থাৎ, তােমরা দ্বীনদারির বিষয়টাকে প্রাধান্য দাও
এভাবে জীবনের প্রত্যেকটা পদে পদে আমরা দুনিয়ার স্বার্থকে প্রাধান্য দেই, আখেরাতের স্বার্থকে প্রাধান্য দেই না এজন্য আমাদের যিন্দেগীর এই অবস্থা। আমরা গোেনাহ থেকে ফিরে আসতে পারিনা, ইবাদত ও সহীহ তরীকার উপরেও উঠে আসতে পারি না। গােনাহ থেকে ফিরে থাকা এবং ইবাদতের উপর উঠে আসা- এই দুটোর মধ্যে ছিল কামিয়াবী ও সফলতা। কিন্তু আমরা এই কামিয়াবী ও সফলতার পথে উঠে আসতে পারছি না, তার কারণ আমরা পদে পদে দুনিয়ার স্বার্থকে প্রাধান্য দেই।

এই দুনিয়ার স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়া থেকে উঠে আসার উপায় কি 

তাও আল্লাহ পাক বলে দিয়েছেন। আর তা হল প্রত্যেকটা পদে পদে আখেরাতকে প্রাধান্য দিতে হবে। তাই আল্লাহ পাক
দুনিয়াকে প্রাধান্য দেয়ার কথা বর্ণনা করার পর বলেছেন,


وَالْاٰخِرَةُ خَيْرٌوَّاَبْقٰى                      


অর্থাৎ, আখেরাত হল উত্তম ও চিরস্থায়ী।
এ আয়াতে প্রত্যেকটা পদে পদে আখেরাতকে প্রাধান্য দিতে বলা হয়েছে, প্রত্যেকটা পদে পদে আখেরাতের ফিকির পয়দা করতে বলা হয়েছে। প্রত্যেকটা কাজ করার সময় আমরা যেন দুনিয়ার
স্বার্থকে প্রাধান্য না দিয়ে আখেরাতের স্বার্থকে প্রাধান্য দেই। প্রত্যেকটা কাজ করার সময় আমরা যেন
দুনিয়ার চিন্তাকে প্রাধান্য না দিয়ে আখেরাতের চিন্তাকে প্রাধান্য দেই। আখেরাতের চিন্তা-ফিকিরকে প্রাধান্য দিলে দুনিয়ার চিন্তা-ফিকির চাপা পড়বে, আর তখনই আমরা গােনাহ থেকে বিরত থাকতে পারব এবং সহীহ তরীকায় থাকতে পারব।
আল্লাহ পাক বলেছেন, আখেরাত হল উত্তম। দুনিয়ার সুখ-সান্তি, আনন্দ যা কিছু আছে কোনটাই উত্তম নয়, বরং আখেরাতেরটাই উত্তম। দুনিয়ার সুখ-শান্তিতে ভেজাল আছে আখেরাতের সুখ-শাস্তিতে কোন ভেজাল নেই। আখেরাতের সুখ-শান্তি নির্ভেজাল। দুনিয়ায় কেউ দ্যর্থহীন ভাবে সুখী হতে পারে না। একটা সুখ আছে তাে আরেকটা দুঃখ লেগে আছে, একটা আনন্দ আছে তাে আরেকটা বেদনা লেগে আছে। কিন্তু আখেরাতের সুখের সাথে কোন দুঃখ নেই, আখেরাতের আনন্দের সাথে কোান বেদনা নেই।

আল্লাহ পাক বলেছেন, আখেরাত হল স্থায়ী বা অনন্ত। অর্থাৎ, আখেরাতের সব সুখ-শান্তি ও অনন্ত, যার কোন শেষ নেই। আখেরাত হচ্ছে অনন্তকালীন, যার কোন অন্ত নেই।

বিপরীত দুনিয়ার সুখ-শান্তি খুবই সামান্য সময়ের জন্য। কাজেই সামান্য সময়ের সুখ-শান্তির জন্য
যদি আমরা আখেরাতের অনন্তকালীন সুখ-শান্তিকে বিসর্জন দিয়ে দেই, তাহলে সেটা হবে অত্যন্ত নির্বুদ্ধিতা ও আহাম্মুকী। দুনিয়ার চিন্তায় আখেরাতকে বিসর্জন দেয়া হল নির্বৃদ্ধিতা ও আহাম্মুকী। এর বিপরীত আখেরোতের চিন্তায় প্রয়ােজনে দুনিয়াকে বিসর্জন দেয়া হল বুদ্ধিমত্তা। অথচ আমরা মনে করি
তার উল্টোটা।

একটা ঘটনা শুনুন। 

বাদশাহ হারুনূর রশীদের দরবারে একজন লােক যাতায়াত করত। সাধারণ ভাবে মানুষ তাকে বলত পাগল। সে প্রত্যেকটা পদে পদে শুধু আখেরাতের কথাই বলত!
প্রত্যেকটা পদে পদে শুধু দ্বীনের কথাই বলত। তাই মানুষে মনে করত লােকটা পাগল- পৃথিবীর আর কিছুই বােঝে না। যেমন এখনও আনেক লােক বলে হুজুররা হল পাগল, হুজুররা প্রগতি বােঝে না, দুনিয়াও বাঝে না, কিছুই বোঝে না শুধু এক পরকালের কথাই বোঝে। বাদশাহ হারুনূর রশীদের
দরবারে যাতায়াতকারী লােকটাও এরকমই পাগল ছিল। বাদশা হারুনুূর রশীদ তার সাথে উপহাস করত। 
একদিন উপহাস করতে করতে বলল। এই যে হুজুর আপনাকে একটা লাঠি দিলাম। কোনদিন যদি দুনিয়ায় আপনার চেয়ে বড় আহাম্মক কাউকে পান, তাহলে লাঠিটা তাকে দিবেন। বাদশাহ
বােঝাল যে, আপনার চেয়ে বড় আহাম্মক আর কেউ নেই। কাজেই আপনি এই লাঠিটা পাওয়ার যােগ্য। এই পাগলের নাম ছিল বাহলুল। সে লাঠিটা নিয়ে কাছে রেখে দিল। বাদশাহ হারুনূর রশীদ যখন মৃত্যু শয্যায় তখন বাহলুল বাদশাহ-র সাথে দেখা করতে এল। এসে বলল, বাদশাহ নামদার
কেমন আছেন? বাদশাহ জবাব দিল হুজুর! আর কি, এখনতাে পরকালে পাড়ি জমাচ্ছি এখনতাে সময়
শেষ! এখন আমার পরকালের সফর শুরু হবে। দোয়া করবেন হুজুর! বাহলুল জিজ্ঞাসা করলেন, এটা
কতদিনের সফর ? বাদশাহ বলল, এই সফরের তো কোন শেষ নেই আনন্তকালীন সফর। বাহলুল
জিজ্ঞাসা করলেন, আগে সৈন্য-সামন্ত কি পরিমাণে প্রেরণ করেছেন ? এতদিন তাে আপনার নিয়েম
ছিল কোন জায়গায় সফরে গেলে আগে সৈন্য সামন্ত, পাইক-পিয়াদা অনেক কিছু পাঠাতেন,
নিরাপত্তার অনেক ব্যবস্থাই সফরের আগে গ্রহণ করতেন। তখন বাদশাহ হারুনুর রশীদ বললেন,
আরে পাগল এখানে আবার পাইক পেয়াদা পাঠানাে যায় কিপ? এখানে তা একাই যেতে হয়, নিঃসঙ্গ
যেতে হয়, কিছুই সাথে যায় না। তখন বাহলূল বলল, বাদশাহ নামদার! তাহলে এই নিঃসঙ্গ সফরের
জন্য কি প্রস্কুতি নিয়েছেন? বাদশাহ বলল, প্রস্তুতি তাে কিছুই নিতে পারিনি। তখন বাহলুল বলল যে,
বাদশাহ নামদার! তাহলে এই লাঠিটা আপনি-ই পাওয়ার যোগ্য। আপনি এটা আমাকে আমানত
স্বরূপ দিয়েছিলেন যে, আমার চেয়ে বড় আহাম্মক কাউকে পেলে তাকে দিয়ে দিব। আমি এটা
আপনাকেই দিয়ে দিলাম। আপনি দুনিয়ার সামান্য একটু সফরের জন্য এত প্রস্তুতি, এত ব্যবস্থাপনা
গ্রহণ করতেন, আর এই মহা সফরের জন্য কোন প্রস্তুতি নিলেন না, তাহলে তাে আপনার চেয়ে
আহম্মক আর কেউ নেই। আমার কাছে মনে হচ্ছে আপনিই সবচেয়ে বড় আহাম্মক, তাই এই লাঠিটা আপনাকেই দিয়ে দিলাম।

আমরাও বড় আহাম্মক 
যে, দুনিয়ার সামান্য কিছু দিনের জন্য এত ফিকির এত চিন্তা, এত প্রস্তুতি, আর মহাকালের প্রস্তুতির জন্য কোন-ই চিন্তা নেই। দুনিয়ার সামান্য সময়ের জীবনে ভবিষ্যতে কখনও না খেয়ে কষ্ট পাব কি না, কখনও চিকিতসার অভাবে কষ্ট পাব কি না,
ভবিষ্যতে বাসস্থানের কোন সংকটে যেন না পড়ি, এই চিন্তায় ব্যাংক ব্যালেঞ্চ কতকিছু করা দরকার বলে মনে করি। তার
জন্য আমরা এত প্রস্তুতি নেই। সেই প্রস্তুতি নিতে গিয়ে কত কষ্ট স্বীকার করি। তার জন্য মাথার ঘাম পায়ে ফেলে শরীরের রক্ত পানি করে অর্থকড়ি সংগ্রহ করি। নিজের জীবনের আরাম পর্যন্ত বিসর্জন দিয়ে সেই অর্থ-কড়ি সঞ্চিত করে রাখি। 
অথচ মহাকালের প্রস্তুতির জন্য ততটুকু ফিকিরও আসে না।

আল্লাহ পাক তাই বলেছেন, 
প্রত্যেকটা পদে পদে দুনিয়ার ফিকির নয় বরং আখেরাতের ফিকির আসতে হবে।

সারকথা 

আল্লাহ রব্বুল আলামীন এই আয়াতের মধ্যে বলেছেন, যারা আকীদা-বিশ্বাসের খারাবী, আখলাক-চরিত্রের খারাবী এবং গোনাহ থেকে মুক্ত থাকবে আর ইবাদতের উপরে উঠে আসবে
তারা হবে কামিয়াব। দুনিয়াকে প্রাধান্য দিলে কামিয়াবী আসবেনা। এখন চিন্তা করে দেখুন আমরা কেন কামিয়াব হতে পারছিনা। আমরা কামিয়াব হতে পারছি না, কারণ প্রত্যেকটা পদে পদে আমরা দুনিয়ার চিন্তা করছি, প্রত্যেকটা পদে দুনিয়ার স্বার্থ চিন্তাকে প্রাধান্য দিচ্ছি। যখন আমরা প্রত্যেকটা পদে আখেরাত কে প্রাধান্য দিতে শিখব তখন আমরা কামিয়াবির পথে উঠে আসতে পারব।

বয়ানের শুরুতে যে আয়াতখানা তেলাওয়াত করেছিলাম,

সেই আয়াতখানা আমরা আবার স্মরণ
করি। আল্লাহ পাক ইরশাদ করেছেন,

 قَدْ اَفْلَحَ مَنْ تَزَكّي ° وَذَكَرَاسْمَ رَبِّهٖ  فَصٰلّٰيٌ.........................ً



অর্থাৎ, অবশ্যই সফলকাম হবে সেই ব্যক্তি যে নিজেকে পবিত্র রাখবে। আর আমাকে স্মরণ করে ইবাদত করবে। বিশেষভাবে নামাযের মাধ্যমে আমাকে স্মরণ করবে। 

আমরা বরং পার্থিব জীবনকে প্রাধান্য দিয়ে থাকি, অথচ আখেরাত হচ্ছে উত্তম ও স্থায়ী।

আল্লাহ রব্বুল আলামীন আমাদের মধ্যে এই আখেরাতের ফিকির পয়েদা করে দিন, যাতে আমরা
ইহাকাল পরকাল উভয় জগতে কামিয়াব হতে পারি। আমীন!


                            
             °واخر دعوانا الحمد لله رب العلمين